পাগলা ভি.আই.পি. জেটি ও মেরি অ্যান্ডার্সন

Image for post
Image for post
১৬ ফেব্রূয়ারি ২০১৪

ঢাকায় থাকেন। ভাবছেন স্পিড বোটে বুড়িগঙ্গা নদী ঘুরবেন। স্বাভাবিক ভাবেই সদর ঘাট যাবেন। সেখানে লঞ্চ আছে, জাহাজ আছে, নৌকা আছে কিন্তু স্পীডবোট নেই। আপনি অবাক! সদরঘাটে স্পিডবোট থাকবে না? হতেপারে দেশের বন্দর নগরীগুলোতে আপনি ঘুরেছেন চাঁদপুর, বরিশাল কিংবা মাওয়া। সেখানকার নদী বন্দর এলাকায় তো স্পিডবোট আছে, সদরঘাট কেন ব্যাতিক্রম? কেউ হয়তো আপনাকে জানালো যেসব নৌরুটে লঞ্চ চলাচল করে সেসব রুটে কম সময়ে যাতায়াতের জন্য স্পিডবোট ভাড়া হয়ে থাকে। যেমন কম সময়ে পদ্মা পারাপারের জন্য লঞ্চ থাকা সত্ত্বেও আমরা মাওয়া থেকে জাজিরা প্রান্তে স্পিডবোটে যাতায়াত করি। শুধু ঘুরে বেড়ানোর জন্য কমই উঠি। ঢাকা থেকে পার্শবর্তী জেলা যেমন নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ যেতে সড়ক পথে স্বল্প সময়ে যাতায়াত করা যায়। হতে পারে এজন্যই সদরঘাটে স্পীডবোটের যাত্রী চাহিদা নেই। উত্তর না হয় পেলেন তারপরেও মনে খুঁতখুঁত তাই বলে সদর ঘাটে স্পিডবোট থাকবে না?

সদরঘাট থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে বুড়িগঙ্গা নদীর পরে পাগলা বাজারের কাছে বি.আই.ডব্লিউ. টি. এ. পরিচালিত একটি ভি. আই. পি. জেটি আছে। এই যেটি একটি সবুজ শোভিত পার্ক। যার বুড়িগঙ্গা নদীর পার ঘেসে আছে অনেক স্পিডবোট, আছে ভাসমান রেস্তোরা ও বার। টুর অপেরাটরদের লঞ্চ আছে যাতে বিসনেস টুর আয়জন করা যায়, শুটিং এর জন্য ভাড়া নেয়া যায়। এতো কিছু থাকা সত্ত্বেও প্রচারণার অভাবে অনেকে এর সম্পর্কে জানে না । আর যারা জানে তাদের একটা অংশ সেখানে যায় না কারণ পার্ক এলাকার পরিবেশ খুব ভালো মানের না এ কারণে।

Image for post
Image for post
১৬ ফেব্রূয়ারি ২০১৪

এই যেটি এলাকার প্রধান আকর্ষণ ছিল এখানকার ভাসমান রেস্তোরাঁটি। যা ২০১৪ সালে আগুনে পুড়ে সম্পূর্ণ ধংশ হয়ে যায়। ভাসমান রেস্তোরাঁর নাম ছিল মেরিন্ডারসন। নির্মিত হয় ১৯৩৩ সালে কলকাতার গার্ডেনরিচ শিপ ইয়ার্ডে (একই শিপইয়ার্ডে দেশের ৪টি প্যাডেল স্টীমার নির্মিত হয়)। জানা যায় তৎকালীন বাংলার গভর্নর এ জাহাজ ব্যবহার করতেন। তার মেয়ের নামেই জাহাজের নামকরণ। দেশ ভাগের পরে পাকিস্তান অথরিটি এর মালিকানা লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধের পরে বি.আই.ডব্লিউ. টি. এ. গঠিত হলে জাহাজটি পরিত্যাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে এর সংস্কার করে বঙ্গবন্ধুকে উপহার স্বরূপ প্রদান করে। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালে তিনি পর্যটন কর্পোরেশনের কাছে জাহাজটি হস্তান্তর করেন ১৯৭৮ সালে। পর্যটন কর্পোরেশন এর সংস্কার করে, ভাসমান রেস্তোরাঁ ও বার সুবিধায় উন্নীত করে পাগলা ভি. আই. পি. জেটির সামনে এনে রাখে। এখানে জেটির পার্ক-এলাকা বি.আই.ডব্লিউ. টি. এ. -এর অধীন ও ভাসমান রেস্তোরা বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের অধীন। স্পীডবোটগুলি ব্যক্তি মালিকানাধীন ও কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানের।

নব্বইয়ের দশকের বহু বাংলা সিনেমায় পাগলার ভি. আই. পি. জেটি ও ভাসমান রেস্তোরাঁটি দেখে থাকবেন। বুড়িগঙ্গা নদীর দৃশ্য বলতে এখানে শুটিং হয়েছে কিংবা কাছাকাছি কোনো স্পটে হয়েছে। স্পীডবোটে গানের দৃশ্য কিংবা লঞ্চে ফাইটিং সব এখানে হয়েছে। এখনো শুটিং হয়ে থাকে, তবে আগের মতো নয় এবং পার্ক এলাকায় মোটেই না। আগেকার দিনে অনেকেই তারকাদের দেখার /শুটিং দেখার বাসনা নিয়ে এখানে আসতেন। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন মেরি এন্ডারসন এর জায়গায় নতুন একটি জাহাজ এনে রাখে। এর নাম সোনারগাঁও ভাসমান রেস্তোরা ও বার। নতুন জাহাজটি পার্কের পাশে বেমানান। স্থানীও লোকজনের সাথে কথা বলে ও যেটি এলাকার পরিবেশ দেখে মনে হয়েছে একমাত্র অবহেলার কারণেই আগের জাহাজে আগুন লাগার মতো দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার পরবর্তী কয়েক বছর জাহাজের ভগ্নাংশ নদীর পারে দেখা গেলেও। এখন আর তার কোনো অস্তিত্ব নেই। আর এভাবেই হারিয়ে গেলো মেরি অ্যান্ডার্সন জাহাজ।

Image for post
Image for post
১৫ অক্টোবর ২০১৪, চ্যানেল ২৪ এর তথ্য অনুযায়ি রেস্তোরার নিচতলার কক্ষ থেকে আগুনের সূত্রপাত। ছবিটি দুদিন পরে তোলা।

২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে থাকি । বেড়াতে যাওয়ার জায়গা বলতে দুটো জায়গা চিনতাম (দুটি পাঠাগার বাদে )। এক. জামতলার পুলিশ লাইন, সেখানে বিখ্যাত বাঙালিদের ভাস্কর্য ছিল, বাগান ছিল, প্রবেশে বাধা নিষেধ ছিল না। দ্বিতীয়টি পাগলার ভি. আই. পি. জেটি। পরেরটি আমার পছন্দের, কারণ সেখানে জায়গা বেশি, ভাসমান রেস্তোরা আছে, লোকজনের জমায়েত আছে, নৌকা আছে-নদীর ওপারে গিয়ে ঘুরে আসা যায়, ভাগ্য ভালো থাকলে নাটক/ সিনেমার শুটিং দেখা যায়। আমার জানা মতে সে সময়ে নারায়ণগঞ্জ শহরে একটা সবুজ পার্ক কিংবা লেক ছিল না, যেখানে কিছুক্ষন হাটা যায়, বসে সময় কাটানো যায়। আবার উল্টোটাও হতে পারে, আমিই হয়তো চিনতাম না।

ঢাকা চলে আসার পর বহু বছর পাগলা যাওয়া হয়নি। ২০১৪-এ ক্যামেরা কিনি। ছবি তুলতে বিভিন্ন জায়গায় যেতাম । একবার পাগলা হয়ে ফতুল্লা পর্যন্ত যাওয়ার মাঝপথে পাগলা জেটিতে গিয়ে ছবি তুলি- পার্ক, নদীর ছবি তুলি, কিন্তু ভাসমান রেস্তোরার ছবি তোলা হয় না। ততদিনে পার্কের পরিবেশ অনেক মলিন হয়ে গেছে। সব জায়গায় অযত্ন অবহেলা ফুটে উঠেছে। কোথাও ফুল গাছ নেই, ঘাস বরো হয়েছে বহুদিন কাটা হয় না, গাছের পরিচর্যা নেই, কোথাও কোথাও ঝোপ /জঙ্গল হয়ে আছে। সব থেকে অবাক করা ব্যাপার পার্কের ভেতরে একটি বহুতল ভবন নির্মাণাধীন। এটি স্টাফ কোয়াটার হবে। সবুজ পার্কের ভেতর স্টাফ কোয়ার্টার হয়, এটা আমার প্রথম দেখা। নির্মাণ কাজ ও নির্মাণ সামগ্রী রেখে পার্কের অর্ধেক এলাকা নষ্ট করে রাখা। এর মাস কয়েক পরে আগুনে পুড়ে যায় মেরিন্ডারসন যার দু দিন পরে গিয়ে আমি জানতে পারি।

Image for post
Image for post
১৬ ফেব্রূয়ারি ২০১৪। যেটি এলাকার পার্ক

শেষবার গিয়েছি গত সেপ্টেম্বরে(২০২০)। পার্কের প্রবেশ গেটের কাছে সিমেন্ট বালি মিক্সচার হচ্ছে। প্রবেশে টিকেট লাগলো না, হতে পারে খেয়ালই করে নি কিংবা টিকেটই লাগে না ইদানিং। স্টাফ কোয়াটার চালু হয়েছে, তাতে লোকজন থাকে, তারা নিশ্চই সবাই এই যেটি এলাকায় কাজ করে না, বি.আই.ডব্লিউ. টি. এ. -এর অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করে কেননা এই জেটিতে এতো স্টাফ নেই এই বিশাল কোয়ার্টারে থাকার মতো (সাকুল্যে ৪/৫ জন হবে) । ৭ বছর আগে যেমন দেখসি তার থেকেও বাজে পার্কার বর্তমান অবস্থা, কোথাও পরিচর্যা নেই। সমগ্র জেটিতে একজন ফুচকাওয়ালা ঝিমুচ্ছিলো। আরেকজন সিগারেট -চিপস বিক্রেতা আছেন। দর্শনার্থীরা অধিকাংশই শ্রমজীবী মানুষ। স্পীডবোট গুলি অলস পরে আছে। লঞ্চ দুটি ছিল না। ভাসমান রেস্তোরাঁটি করোনার কারণে বন্ধ আছে। নতুন জাহাজটি এই পার্কের সাথে যায় না।। যারা অন্তত ওই রেস্তোরায় খেতে আসবেন তারা এই পার্ক পছন্দ করবেন না।

এমন হওয়ার কারণ কি? দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণেই কি এখানকার এই বেহাল দশা? যদি তাই হয় তাহলে, একটা প্রতিষ্ঠানকে কেন রেস্তোরা ও জেটির দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে না? হতে পারে বি.আই.ডব্লিউ.টি.এ. এর আগেই প্ল্যান ছিল এখানে অবকাঠামো নির্মাণের, ফাঁকা ছিল বলেই হয়তো পার্ক করে সাজিয়ে রেখেছিল। এখন দরকার হয়েছে তাই ভবন নির্মাণ করেছে। তাই বলে স্টাফ কোয়ার্টার? যে স্টাফদের সাথে যেটির কোনো সম্পর্ক নে? তাহলে এতো বছর লোকজনকে কেন টিকেট কেটে প্রবেশে বাধ্য করা হলো? আর ভি.আই. পি. জেটি ইবা কেন নাম দেয়া হলো? কি কারণে এটি ভি.আই. পি. জেটি? নদীর পারে যে কোনো জায়গায় ভাসমান রেস্তোরাঁটি রাখলেই হলো, এখানে রাখার দরকার কি? এই পরিবেশে তো নতুন জাহাজটিও সেফ না।

ভয় এখন প্যাডেল স্টিমার গুলি নিয়ে। হয়তো অনেকেই জানেন পি. এস. অস্ট্রিচ কে রাজনৌতিক দল সংশ্লিষ্ট একটি পরিবারের কাছে নুন্নতম ভাড়ায় লীজ দেয়া হয়েছে। ভয়, কবে না জানি এরও দুর্ঘটনার খবর পাই। লীজ না দিয়ে এই স্টিমারগুলি রিটায়ারমেন্ট এর পর্যায়ক্রমে নৌ-জাদুঘরে রূপান্তর করা হোক। একটি ঢাকা, একটি চাঁদপুর, একটি বরিশাল ও একটি খুলনায় রাখা হোক। ওইসব নগরীতে পর্যটনের আরেকটি পালক যুক্ত হবে।

Image for post
Image for post
১৬ ফেব্রূয়ারি ২০১৪। পার্কের ভেতর নির্মাণাধীন কোয়ার্টার।
Image for post
Image for post
১৬ ফেব্রূয়ারি ২০১৪। পার্কে ঘেসে নদীর পারে স্পীডবোট রাখা

Get the Medium app

A button that says 'Download on the App Store', and if clicked it will lead you to the iOS App store
A button that says 'Get it on, Google Play', and if clicked it will lead you to the Google Play store